
সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা
নির্মাণসামগ্রীর বাজারে ধস
- আপলোড সময় : ১৫-১০-২০২৪ ১২:৪৩:৪৮ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৫-১০-২০২৪ ১২:৪৩:৪৮ অপরাহ্ন


সরকারের অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বেসরকারি আবাসন শিল্পেও।
গত দুই মাসে কোম্পানিভেদে রডের বিক্রি ৫০-৭০ শতাংশ এবং সিমেন্টের বিক্রি ৩৫-৪০ শতাংশ কমেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ফলে দেশে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে ধস নেমেছে। বর্তমানে সরকারের অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বেসরকারি আবাসন শিল্পেও। ফলে নির্মাণকাজের প্রধান দুই উপকরণ রড ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের মাথা হাত। গত দুই মাসে কোম্পানিভেদে রডের বিক্রি ৫০-৭০ শতাংশ এবং সিমেন্টের বিক্রি ৩৫-৪০ শতাংশ কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিক্রি কমে যাওয়ায় রড ও সিমেন্ট কোম্পানিগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সিমেন্ট ও ইস্পাত খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার পরিবর্তনের পর স্তিমিত হয়ে পড়েছে দেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। গা ঢাকা দিয়েছে নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত অনেক ঠিকাদার। সিটি করপোরেশন থেকে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের উন্নয়নকাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ড্যাপের কারণে আবাসন খাতে বেচাবিক্রি ও নতুন প্রকল্পও কমে গেছে। তাতে ব্যাপকভাবে কমেছে রড-সিমেন্টের বিক্রি। ফলে ওই দুই খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তাদের মতে, ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বিনিয়োগের তো প্রশ্নই আসে না। সূত্র জানায়, বাজারে বর্তমানে প্রতি টন রড বিক্রি হচ্ছে ৮৬ হাজার থেকে ৮৭ হাজার টাকায়। গত মে-জুন মাসেও রডের দাম ছিল ৯০ হাজার টাকার বেশি। আর মে-জুনের তুলনায় সিমেন্টের দাম প্রতি বস্তায় কমেছে (৫০ কেজি) ২০-২৫ টাকা। গত দুই মাসে রডের বিক্রি ৬০-৭০ শতাংশ কমেছে। ফলে খাত সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ীই ব্যাংক ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। তাতে নতুন করে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ বর্তমানে ১ টন রড উৎপাদনে খরচ ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা হলেও বিক্রি করছে ৮৬ হাজার টাকায়। বিদ্যমান অবস্থায় অর্থাভাবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ৮০ হাজার টাকায়ও রড বিক্রি করছে। বর্তমানে রডের বিক্রি ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। বাজারে চাহিদা খুব কম। ব্যাংকগুলো এখন কেবল বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীকে সুবিধা দিচ্ছে। মাঝারি কোম্পানিগুলো সেভাবে সহায়তা পাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অথছ দেশে ইস্পাত কারখানার সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। তার মধ্যে বড় প্রতিষ্ঠান ৪০টি। প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন রড উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। যদিও দেশে বার্ষিক রডের ব্যবহার ৭৫ লাখ টন। এখন পর্যন্ত এই খাতে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। বছরে লেনদেনের পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকা। সূত্র আরো জানায়, সিমেন্ট ব্যবসায় বর্তমানে প্রবৃদ্ধির বদলে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি (ডি গ্রোথ) দেখা দিয়েছে। অথচ ঋণের সুদের হার বেড়েছে। তাতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা কমে যাওয়ায় বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করতে হচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে দেশের সিমেন্ট শিল্প। দেশে ৪০টি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবছর প্রায় ৪ কোটি টন সিমেন্ট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাট টন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় বর্তমানে অনেক কোম্পানিই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অন্তর্বতীকালীন সরকার এখন পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেয়নি। ফলে ধারণা করা হচ্ছে রাজনৈতিক সরকার আসা না পর্যন্ত সেভাবে উন্নয়ন প্রকল্প হবে না। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা একধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। দেশে সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেলসহ দেশের সব বড় মেগা প্রকল্পে সিমেন্ট সরবরাহ করে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির সিমেন্টের বিক্রি আগের প্রান্তিকের (মার্চ-জুন) তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এদিকে রডের বাজার প্রসঙ্গে বিএসএমএর সভাপতি ও জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, অনেক দিন ধরেই ইস্পাত খাত নানা সমস্যায় ভুগছে। গত প্রায় দুই বছর বড় সমস্যা ছিলো ডলার সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি। তবে ডলারের বাজার এখন মোটামুটি স্থিতিশীল আছে। এখন নতুন সমস্যা হয়ে সামনে এসেছে পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া। গত দুই মাসে রডের বিক্রি ৬০-৭০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি সিমেন্টের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ৪০ শতাংশের মতো কমেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে নতুন করে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিরুল হক জানান, মূলত দুই কারণে বিক্রি কমেছে। প্রথমত, বড় কিছু অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ থমকে গেছে। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ে নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন নির্মাণকাজ। ফলে প্রবৃদ্ধির বদলে সিমেন্ট ব্যবসায় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি (ডি গ্রোথ) দেখা দিয়েছে।
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ